বিশেষ প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে বিভিন্ন দোকান থেকে খালি বিল-ভাউচার সংগ্রহ করে অফিসের কর্মচারীদের দিয়ে বিল প্রস্তুতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। এ ঘটনায় সংস্থাটির প্রোগ্রামার মো. হোসেন বিন আমিনকে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে শুধু ‘তিরস্কার’ দণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বিসিসির নির্বাহী পরিচালক এস এম আশরাফুল ইসলামের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ তথ্য জানা গেছে।
আদেশ অনুযায়ী, হোসেন বিন আমিন রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের তৎকালীন সেন্টার-ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোর আপ্যায়ন ব্যয়ের বিল তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, তিনি বিভিন্ন দোকান থেকে খালি বিল-ভাউচার সংগ্রহ করে অফিসের কর্মচারীদের মাধ্যমে সেগুলোতে বিল প্রস্তুত করতেন।
বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগটির সত্যতা পাওয়া যায়। কর্তৃপক্ষের আদেশেও খালি ভাউচার এনে বিল-ভাউচার প্রস্তুতের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তবে এসব বিলের মাধ্যমে হোসেন বিন আমিন ব্যক্তিগতভাবে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন—এমন প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। একইভাবে কোনো প্রশিক্ষণার্থী খাবার পাননি—এমন প্রমাণও মেলেনি।
তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ ছিল, রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের অন্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না করে তিনি অধিকাংশ প্রশিক্ষণে নিজেই প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। একই দিনে দুটি কোর্সে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে উভয় কোর্স থেকেই সম্মানী নেওয়ার অভিযোগও ছিল। তবে তদন্তে এসব অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
পরে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা, ২০০২-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ৮ জুন তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তাঁর জবাব, তদন্ত কর্মকর্তার প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে একটি অভিযোগ প্রমাণিত বলে সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
এর পরিপ্রেক্ষিতে হোসেন বিন আমিনকে প্রবিধানমালার ৩৭(খ) অনুযায়ী অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে দণ্ড হিসেবে ৩৮(১)(ক)(অ) অনুযায়ী তাঁকে ‘তিরস্কার’ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, বিভাগীয় শাস্তির প্রায় এক বছর পরই তিনি পদোন্নতি পান। পরবর্তী সময়ে বিসিসির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানে একাধিক দায়িত্বও পালন করেন তিনি।
৫ আগস্টের আগে হোসেন বিন আমিন ‘কানেক্টেড বাংলাদেশ’ প্রকল্পে ডেপুটি প্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি), সফটওয়্যার কোয়ালিটি অ্যান্ড টেস্টিং সেন্টারে সিনিয়র প্রোগ্রামার এবং বিসিসির BKICT-তে সিনিয়র প্রোগ্রামার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। BKICT-তে দায়িত্ব পালনকালে ই-রিক্রুটমেন্ট সিস্টেম ক্রয়-সংক্রান্ত কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বিসিসির ম্যানেজার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্তমানে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন বলে জানা গেছে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, একটি প্রকল্পের উপ-পরিচালক, একটি সংস্থার পরিচালক এবং একটি সংস্থার ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনের তথ্য রয়েছে।
বিসিসির বিভিন্ন দায়িত্বে থাকাকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ও শাস্তির বিষয়টি নথিতে রয়েছে।
এদিকে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০০৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের এক নেতার সুপারিশে তাঁর চাকরি হয়। তবে এ দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার মতো নথি পাওয়া গেছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তুলেছেন। তাঁদের ভাষ্য, যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তিনি সেই সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। তবে এটি সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ; এর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এবং অতীতে বিভাগীয় অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিসিসির ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে।
এসব অভিযোগ ও তাঁর দায়িত্ব পালনের বিষয়ে মো. হোসেন বিন আমিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।”
তাঁর এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

