বহু বছরের অপেক্ষা, অসংখ্য প্রত্যাশা আর শিরোপার স্বপ্ন—সবকিছুর পরিণতি ঘটল বিরাট কোহলির ব্যাটে। জয়ের জন্য যখন প্রয়োজন ছিল মাত্র এক রান, তখনই আরশাদ খানের শেষ বলটি গ্যালারিতে পাঠিয়ে উৎসবের সূচনা করেন বেঙ্গালুরুর তারকা ব্যাটার। আহমেদাবাদের দর্শকভরা স্টেডিয়াম মুহূর্তেই রঙিন হয়ে ওঠে উল্লাসে। ম্যাচ জয়ের পর হেলমেট খুলে দুই হাত প্রসারিত করে উদযাপন করেন কোহলি, আর সেই দৃশ্যই হয়ে থাকে বেঙ্গালুরুর টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের প্রতীক।
রোববারের ফাইনালে শুরু থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বেঙ্গালুরুর হাতে। গুজরাটের ব্যাটাররা বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে তারা থামে মাত্র ১৫৫ রানে। আইপিএলের ইতিহাসে এর চেয়েও কম রান করে দল জয়ের নজির থাকলেও ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সেই সংগ্রহকে খুব একটা চ্যালেঞ্জিং মনে হয়নি।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে বিরাট কোহলি ও বেঙ্কটেশ আয়ার দারুণ সূচনা এনে দেন বেঙ্গালুরুকে। তাদের আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিংয়ে ম্যাচের রূপরেখা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। যদিও মাঝপথে কয়েকটি দ্রুত উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে দলটি। তবে অভিজ্ঞ কোহলি শেষ পর্যন্ত দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেন।
জয়ের শট খেলার পর বেঙ্গালুরুর ক্রিকেটাররা মাঠে ছুটে এসে উদযাপনে মেতে ওঠেন। কিছুক্ষণ পরই কোহলির চোখ খুঁজতে থাকে স্ত্রী আনুষ্কা শর্মাকে। গ্যালারিতে তাকে দেখতে পেয়েই তিনটি উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দেন তিনি। পরে ফোনে কথা বলতেও দেখা যায় দুজনকে।
ম্যাচসেরা পুরস্কার গ্রহণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কোহলি বলেন, “সত্যি বলতে, এখনও মনে হচ্ছে যেন স্বপ্ন দেখছি। বহুবার কল্পনা করেছি যে আমরা ট্রফি জিতেছি এবং জয়ের শটটা আমার ব্যাট থেকেই এসেছে। তবে এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সবাই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। এখনকার ক্রিকেটে তরুণরা সব সময় আপনাকে আরও ভালো করার চ্যালেঞ্জ দেয়, সেটাই আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে।”
এর আগে সম্প্রচারকারী চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোহলি জানান, এবার দলের ওপর চাপ তুলনামূলক কম ছিল। তার ভাষায়, “আমি ছেলেদের বলেছিলাম, গতবারের মতো চাপ এবার নেই। আমরা জানতাম এই দল কী করতে পারে। লিগ পর্বে আমরা সবার ওপরে ছিলাম। নিজেদের পরিকল্পনা ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে আমাদের হারানো কঠিন হবে—এই বিশ্বাস ছিল সবার মধ্যেই।”
দলের যাত্রাপথ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কোহলি বলেন, মাঝপথে কিছুটা ধাক্কা খেলেও আত্মবিশ্বাস হারায়নি দল। “বিরতির পর দুটি ম্যাচ কঠিন ছিল। একটি হেরেছিলাম, আর মুম্বাইয়ের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে জিতেছিলাম। সেই জয়টাই আমাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। এরপর আমরা ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলেছি এবং লিগ পর্বও শীর্ষে শেষ করেছি।”
শিরোপা জয়ের কৃতিত্ব পুরো দলকে দিয়েছেন কোহলি। তিনি বলেন, “এত বছর অপেক্ষা করেছি, কিন্তু এই দলটা একসঙ্গে হওয়ার পর কখনও মনে হয়নি আমাকে একাই ম্যাচ জেতাতে হবে। আমি জানতাম, পাশে এমন অনেক ক্রিকেটার আছে যারা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। মৌসুমজুড়ে অনেকেই ম্যাচসেরা হয়েছে, যা প্রমাণ করে সবাই অবদান রেখেছে।”
দলের বোলিং ইউনিটের প্রশংসা করে তিনি বলেন, “হ্যাজলউড, ভুবনেশ্বর ও ডাফির মতো বিশ্বমানের বোলার আমাদের দলে আছে। ক্রুণাল সবসময় নির্ভরযোগ্য, আর রাসিখ দারও দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছে। ব্যাটাররাও নিজেদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেছে। এই ভারসাম্যপূর্ণ দলের অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত। এখন আমরা সত্যিকারের একটি অলরাউন্ড দল, আর সেটাই মাঠে বাড়তি আত্মবিশ্বাস এনে দেয়।”
বহু প্রতীক্ষার পর শিরোপা জয়ের এই রাত শুধু বেঙ্গালুরুর জন্য নয়, বিরাট কোহলির ক্যারিয়ারেরও অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। কারণ, এবার ট্রফি জয়ের গল্পের শেষ লাইনটি লিখেছেন তিনি নিজেই—নিজের ব্যাটের এক উড়ন্ত ছক্কায়।


