** ১ শতাংশ সম্পদ কর চালু হচ্ছে, বছরে বাড়তি আদায় হবে ৫০০০ কোটি টাকা
** মদ আমদানিতে শুল্ককর বাড়ছে, সিগারেট ও সব ধরনের দাম পণ্যের দাম বাড়বে
** মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকসার উপর কর বসাতে প্রধানমন্ত্রীর সায়
** মধ্যবিত্ত যাতে চাপে না পড়ে সেভাবে বাজেট প্রস্তুত করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ
** ঢালাওভাবে করছাড় না দিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে করছাড় দিতে নির্দেশ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ কর চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এতে বছরে সরকারের প্রায় ৫০০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব হবে। এছাড়া সিগারেটসহ সকল ধরনের তামাক পণ্যের দাম বাড়ানো, মদ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশার ওপর প্রথমবারের মতো অগ্রিম আয়কর আরোপের চিন্তাও করা হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের করের চাপ কমানো এবং করমুক্ত আয়ের সীমা বর্তমানের সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে ধীরে ধীরে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সচিবালয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থবছরের বাজেট নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সংক্রান্ত বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বাজেট নিয়ে যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি না হয়-সেদিকে খেয়াল রাখার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রণালয় ও এনবিআর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) সকালে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানসহ অর্থ বিভাগ ও এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে এসব দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
সূত্রমতে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে দেশের ৫৫তম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যেখানে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে বড় লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিশেষ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি কর্মকর্তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বা হার না বাড়িয়ে, করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হবে। আগামী বাজেট যাতে ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানবান্ধব হয় সেই বিষয়টিও খেয়াল রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বড় বাজেট সব সময় ভালো, কারণ বাজেট বড় হলেই দেশের জন্য বড় বড় কাজ করা যাবে। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের বিষয়টি উল্লেখ করে কর্মকর্তাদের তিনি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, খাল কাটা কর্মসূচি এবং সৃজনশীল অর্থনীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এসব কর্মসূচির পাশাপাশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এজন্য ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ এবং এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কর অফিসগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার ভীতি দূর করার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন তারেক রহমান।
সূত্র জানায়, বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে তাদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় উচ্চাভিলাষী মনে হলেও এটি অর্জন সম্ভব যদি আমরা প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি। অটোমেশন ও ইন্টিগ্রেশন বিষয়ে চেয়ারম্যান জানান, বিআরটিএ, বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসি’র মতো সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর ডাটাবেজের সঙ্গে এনবিআরের সিস্টেমের পূর্ণ সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে করে উচ্চবিত্ত বা সম্পদশালীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিশ্লেষণ করে তাদের করের আওতায় আনা সহজ হবে। কর ফাঁকি রোধে এখন থেকে ম্যানুয়াল অডিটের পরিবর্তে ডেটাচালিত অডিট করা হবে। বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে আমদানিকারকদের ভ্যাট ও ট্যাক্স প্রদানের তথ্য রিয়েল-টাইম মনিটর করা হবে। এছাড়া দেশে প্রায় এক কোটির ওপরে টিআইএনধারী থাকলেও নিয়মিত রিটার্ন জমা দেন তার অর্ধেকেরও কম। এনবিআরের লক্ষ্য হবে এই গ্যাপ কমিয়ে আনা। কোনোভাবেই বিদ্যমান করহার বাড়ানো হবে না, বরং করের আওতা বাড়ানো হবে। এছাড়া কাস্টমস ও ভ্যাট আহরণে কঠোরতা প্রদর্শনের পাশাপাশি কর্মকর্তাদের পেশাদারত্ব নিশ্চিত করতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দেন এনবিআর চেয়ারম্যান।
সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে অপ্রদর্শিত অর্থ ও বিশেষ বিনিয়োগ সুযোগ সম্পর্কিত বিধানগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে আগামী অর্থবছর থেকে ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক ছাড়ের সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। এ ছাড়া আগামী বাজেটে তামাকজাত পণ্য ও বিদেশি মদের দাম বাড়তে পারে। এতে রাজস্ব বাড়বে এবং মানুষের ভোগ কমবে। চলমান জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব পরিবহনের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। অনুমোদিত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোম্পানির উৎপাদিত মদের ওপর ভ্যাট বা মূসক আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া এখন থেকে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হলে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) প্রয়োজন হবে। এই বিআইএন ইস্যু করার প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে এবং ভ্যাট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়াই তা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে। যদিও এনবিআরের চাল ও ডালের মতো বেশকিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্থানীয় ও আমদানি পর্যায়ে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তাতে প্রধানমন্ত্রী কোনো সায় দেননি। ফলে এসব পণ্যের কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত কার্যকর হচ্ছে না।
একাধিক সূত্রমতে, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে সম্পদ করের প্রস্তাব এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে নির্দিষ্ট আয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। এর মাধ্যমে উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীকে আরও কঠোর নজরদারির মধ্যে আনতে হবে। সরকারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নিম্ন আয়ের গোষ্ঠীকে যতটা সম্ভব কম কষ্ট দেওয়া। এনবিআরের হিসাব বলছে, ১ শতাংশ সম্পদ কর বসানো হলে বছরে অন্তত ৫০০০ কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে। টার্নওভার কর বৃদ্ধির কোনো পরিকল্পনা নেই সরকারের; বরং করের আওতা বাড়ানোই সরকারের মূল লক্ষ্য। করছাড়ের পাশাপাশি পরিবেশগত বিষয়ও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আর্থিক ও করনীতি যেন পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নকে সহায়তা করে—এ বিষয়ে জোর দিতে বলেছেন।
মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে ১১১ থেকে ১২৫ সিসির জন্য বার্ষিক কর ১ হাজার টাকা, ১২৬ থেকে ১৬৫ সিসির জন্য ৩ হাজার টাকা এবং ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেলের জন্য ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রে (৩,৫০০ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতা) অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ১,৫০০ সিসি পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ২৫ হাজার টাকার অগ্রিম আয়কর অপরিবর্তিত থাকবে।
তবে, একাধিক সূত্র বলছে, প্রধানমন্ত্রী কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাজেটে পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী বাজেটে ঢালাওভাবে করছাড় দেওয়া হবে না। তবে ব্যবসা-বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কিছু ক্ষেত্রে কর ছাড় দেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা খাত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কী ভূমিকা রাখছে-তা বিবেচনায় নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র: বিজনেস বার্তা

