একই পরিবারের পাঁচ সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে যখন গাজীপুরের কাপাসিয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে, তখন সেই শোকাতুর পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়ে মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া। গভীর রাতে সরকারি তৎপরতা আর ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতায় নিহতদের মরদেহ শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো হয়েছে তাদের নিজ জেলা গোপালগঞ্জে।
তার আগে গতকাল সকালেই শোকস্তব্ধ ঘটনাস্থলে প্রশাসনের পদস্থ কর্মকর্তারা হাজির হন। কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে এই লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ঘটনাস্থলে ছুটে যান প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব সালমা খাতুন, কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার জনাব তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জনাব মোঃ নাহিদুল হক এবং জেলা প্রশাসনের দুইজন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন। ঘটনার ভয়াবহতা দেখে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন ।
জেলা প্রশাসক প্রমাণ করলেন নিয়মের ঊর্ধ্বে মানবিকতার স্থান। িসাধারণত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বেলা ২টার পর ময়নাতদন্ত বন্ধ থাকে। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতা এবং মরদেহগুলোর জখমের কারণে দ্রুত পচনের আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক স্বয়ং উদ্যোগী হন। তিনি সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সাথে যোগাযোগ করে বিশেষ ব্যবস্থায় গতরাতের মধ্যেই ৫টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করেন।
ময়না তদন্ত হলেও বাঁধ সাধতে পারে বৃষ্টি এ চিন্তা থেকে তিনি ফ্রিজিং ভ্যানের ব্যবস্থা করে দেন। মরদেহগুলো গোপালগঞ্জে নেওয়ার জন্য প্রথমে পিক-আপ ভ্যানের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ পথের কথা চিন্তা করে বিচলিত হয়ে পড়েন জেলা প্রশাসক। তিনি অনুভব করেন, বৃষ্টি নামলে লাশগুলোর অমর্যাদা হতে পারে এবং পচন ত্বরান্বিত হতে পারে।
তিনি বলেন- “মানুষ চলে গেলেও তার মরদেহের মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।” — এই মর্মবোধ থেকেই তিনি ব্যক্তিগত তদারকিতে দুটি অত্যাধুনিক ফ্রিজিং ভ্যানের (ফ্রোজেন গাড়ি) ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, দাফন ও পরিবহন সংক্রান্ত যাবতীয় আর্থিক সহায়তার দায়ভারও তিনি নিজে বহন করার সুব্যবস্থা করে দেন।
গোপালগঞ্জ জেলার পাইককান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহাদত মোল্লার কন্যা শারমিন খানম (৩৫) এবং তার পরিবারের সদস্যদের এই খুনে এলাকায় শোকের মাতম চলছে। নিহতরা হলেন: শারমিন খানম (৩৫), তার ভাই রসুল (২২), ফোরকান -শারমিন দম্পতির তিন কন্যা মিম (১৬), মারিয়া (০৮) ও ফারিয়া (০২)। পুলিশের ধারণা শারমিনের স্বামী ফোরকানই এ মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তারপর থেকে সে পলাতক ।
গভীর রাতে যখন ফ্রিজিং ভ্যানগুলো গোপালগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন সেখানে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রশাসনের এই মানবিক রূপ দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শোকের এই কঠিন সময়ে জেলা প্রশাসনের এমন দ্রুত ও সংবেদনশীল পদক্ষেপ জনমনে আশার আলো সঞ্চার করেছে।


