ভারতের জয়পুরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের ওপর হামলার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার শহীদ স্মারকে অনুষ্ঠিত দলের বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় একদল যুবক তাকে প্রকাশ্যে চড় মারলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরে হামলাকারীদের সঙ্গে সিজেপি সমর্থকদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
দক্ষিণ বিভাগের ডিসিপি রাজর্ষি রাজ বর্মা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচজন হলেন রোহিত শর্মা (২৫), রাকেশ গুর্জর (৩০), অজয় শর্মা (২৫), কুলদীপ সিং (২৭) এবং নিকেত (২৮)। তাদের ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৭০ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এই ধারায় সম্ভাব্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ প্রতিরোধের জন্য আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ঘটনার তদন্তও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ, শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন সমস্যা, বেকারত্ব এবং তরুণদের নানা দাবি তুলে ধরতে এই বিক্ষোভের আয়োজন করে সিজেপি। কর্মসূচিতে অংশ নিতে শত শত মানুষ শহীদ স্মারকে জড়ো হন।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা দুর্নীতি ও পরীক্ষায় অনিয়মের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ করো’ এবং ‘আমি দেশকে ভালোবাসি, দুর্নীতি মেনে নিই না’ লেখা ছিল। অনেকেই জাতীয় পতাকাও বহন করেন। বিক্ষোভকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সমর্থকদের কাঁধে চড়ে অভিজিৎ দিপকে বিক্ষোভস্থলে প্রবেশ করছিলেন।
এ সময় ভিড়ের মধ্যে থাকা কয়েকজন যুবক তার কাছে গিয়ে একাধিকবার চড় মারেন। এতে ঘটনাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। হামলার পর দিপকের সমর্থকেরা কয়েকজন অভিযুক্তকে ধরে ফেলেন এবং তাদের মারধর করেন। পরে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং কয়েকজনকে আটক করে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের একজন রাকেশ গুর্জরকে পুলিশ যখন নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তিনি নিজেকে একজন জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিজিৎ দিপকের বিরুদ্ধে মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তোলেন।
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এরা জিহাদি মানসিকতার মানুষ।’ বিক্ষোভ শেষে দিপকের সমর্থকেরা তাকে ঘিরে মানববেষ্টনী তৈরি করেন। পরে তাকে নিরাপদে একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। এ সময় সমর্থকেরা ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘ভারত মাতা কি জয়’ স্লোগান দেন।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিজিৎ দিপকে হামলার নিন্দা জানান। তিনি লেখেন, ‘শারীরিক হামলা ভয় ও কাপুরুষতার পরিচয়। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আওয়াজ তুলতে থাকব। আমি গান্ধী ও আম্বেদকরের আদর্শে বিশ্বাসী। শান্তি ও ভালোবাসার মাধ্যমেই এই লড়াই চালিয়ে যাব।’ একই পোস্টে তিনি আবারও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেন। সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা বলেন, পুলিশ যদি নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে দল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার বিষয়টি বিবেচনা করবে।
তার দাবি, হামলাকারীরা একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের (বিজেপি) সঙ্গে যুক্ত এবং তাদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, পুরো ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিল। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের পরিচয় জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। রাঙ্কা বলেন, এই অত্যন্ত নিন্দনীয়। জয়পুরে এমন ঘটনা ঘটায় একজন গর্বিত রাজস্থানি হিসেবে তিনি লজ্জিত।
হামলার পরও বিক্ষোভ কর্মসূচি বন্ধ হয়নি। অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্নপত্র ফাঁস, দুর্নীতি ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে সমাবেশে বক্তব্য দেন অভিজিৎ দিপকে। তিনি সমর্থকদের ধর্ম ও জাতপাতের ভিত্তিতে বিভক্ত না হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। দিপকে বলেন, এখানে হিন্দু-মুসলিম রাজনীতি কাজ করবে না। ত্যাগের মাধ্যমে তারা স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। তাই ধর্ম বা জাতের ভিত্তিতে বিভক্ত হওয়া উচিত নয়। তিনি আরো ঘোষণা দেন, আগামী ২০ জুন দল আবার দিল্লির উদ্দেশে পদযাত্রা করবে। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনও অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিক্ষোভ চলাকালে আরো কিছু ছোটখাটো গোলযোগের ঘটনাও ঘটে। এক পর্যায়ে স্লোগান দেওয়া নিয়ে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তর্ক শুরু হলে পুলিশ হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি শান্ত করে। এ ছাড়া অনেক অংশগ্রহণকারী তাদের মোবাইল ফোন চুরি হওয়ার অভিযোগ করেন। পরে আয়োজকেরা মঞ্চ থেকে সবাইকে নিজেদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বিক্ষোভ শেষে আয়োজকেরা জানান, মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাগুলো নিয়ে তারা পুলিশের কাছে পৃথক অভিযোগ দায়ের করবেন।

