জয়পুরহাট সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আরিফ হোসেনের বিরুদ্ধে মাদকসেবন, একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক, যৌতুক দাবি ও নির্যাতনের অভিযোগ তুলেছেন তার স্ত্রী শামিয়া খান এশা। তিনি অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রোববার (২৬ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন এশা।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই মো. আরিফ হোসেনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের সময় তার পরিবার সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার আসবাবপত্র ও অন্যান্য উপহার দেয়। এ ছাড়া স্বর্ণালংকার, মূল্যবান ঘড়ি ও হীরার আংটিসহ প্রায় ১৪ লাখ ৮০ হাজার টাকার উপহার দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, বিয়ের পর প্রথম দিকে আমাদের সংসার স্বাভাবিক ছিল। চাকরির সুবাদে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জয়পুরহাটে সংসার করে আসছিলাম। ২০২০ সালের ৩১ অক্টোবর তাদের ঘরে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। বর্তমানে মেয়েটির বয়স প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর।
এশার অভিযোগ, বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই তার স্বামীর আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেন। তিনি নিয়মিত মদ্যপান ও মাদকসেবন শুরু করেন এবং বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। পাশাপাশি একাধিক নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ বিষয়ে ভিডিওসহ বিভিন্ন ধরনের প্রমাণ তার কাছে রয়েছে বলেও জানান।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার অনুপস্থিতিতে বাসায় বিভিন্ন নারীকে নিয়ে আসা হতো। কখনো কখনো বন্ধুদের নিয়ে মদ্যপান ও নারীসঙ্গেও লিপ্ত হতেন। এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে এশা বলেন, একপর্যায়ে সে কামরুন জাহান বিথী নামে এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তাকে বাসায় এনে সম্পর্ক চালিয়ে যান। বিষয়টি নিয়ে তিনি রামপুরা থানায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করলে তার ওপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায়।
তিনি অভিযোগ করেন, পরবর্তী সময়ে তার স্বামী ৪০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। সংসার টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তার বাবা-মা গ্রামের জমি বিক্রি করে নগদ অর্থ ও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে সেই টাকা দেন। ওই অর্থের মধ্যে ১২ লাখ টাকা দিয়ে কাগজপত্রবিহীন একটি প্রিমিও গাড়ি কেনা হয়। পাশাপাশি পূর্বাচলে জমি কেনাসহ বিলাসবহুল জীবনযাপন শুরু করেন। এরপরও আরও ৫০ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এশা বলেন, গত ৯ জানুয়ারি গভীর রাতে জয়পুরহাটের ভাড়া বাসায় যৌতুকের দাবিতে আমাকে একাধিকবার মারধর করা হয়। এ সময় আমার শিশুকন্যাকেও মারধর করা হয়। পরে আমাদের বাসা থেকে বের করে দেওয়া হলে পাশের বাসায় আশ্রয় নিই। পরে স্থানীয় সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিই।
তিনি জানান, পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় তাদের থানায় নেওয়া হয় এবং সাত দিন নিরাপত্তা দেওয়া হয়। সে সময় পুলিশ সুপার তার স্বামীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে আরিফ আমার ও আমার কন্যাসন্তানকে কোনো ধরনের ভরণ-পোষণ দিচ্ছেন না এবং খোঁজখবরও রাখছেন না। বরং পরকীয়ায় জড়িয়ে আমাকে তালাক দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, গত ৩০ মে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় ‘বাবু’ নামে এক বন্ধুর বাসায় স্বামীকে মদ্যপ অবস্থায় এক নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দেখতে পান। প্রতিবাদ করলে তার মাথায় মোবাইল ফোন দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে তিনি রক্তাক্ত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এরপর তিনি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন, যা গত ৭ জুন পুলিশ সদর দপ্তর গ্রহণ করে।
এ ছাড়া আইজিপি, রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি এবং জয়পুরহাটের পুলিশ সুপারের কাছেও লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান তিনি। পাশাপাশি নির্যাতনের ঘটনায় গত ৫ জুলাই ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি সি আর মামলা (নং-৬৯৬/২০২৬) দায়ের করেছেন। তার দাবি করেন, নির্যাতনের ছবি, অডিও রেকর্ড, ভিডিও, বার্তা, মাদকসেবনের ভিডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত আদালতে পেনড্রাইভের মাধ্যমে জমা দেওয়া হয়েছে।
এশার অভিযোগ, মামলার বিষয়টি জানার পর আরিফ ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গত ৯ জুলাই জয়পুরহাট সদর থানায় তার ও তার বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর থেকে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং সাক্ষীদেরও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমি ও আমার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছি। অভিযুক্ত কর্মকর্তা দায়িত্বে বহাল থাকায় নিরপেক্ষ বিচার পাওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তাই তাকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার বা ক্লোজড করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
সংবাদ সম্মেলনের শেষে শামিয়া খান এশা বলেন, আমি একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী ছিলাম। আমি বিশ্বাস করেছিলাম, তিনি আইন রক্ষা করবেন। কিন্তু আজ আমি নিজেই আইনের আশ্রয় নিয়ে ন্যায়বিচার চাইছি। দেশের গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংগঠন, বাংলাদেশ পুলিশ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগের প্রতি আমার আহ্বান—আমার অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

