আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু নতুন চমক আসতে পারে। বিশেষ করে কর অব্যাহতির সুবিধা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ভিআইপিদের কর সুবিধা বাতিলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যসহ অন্যান্য বিশেষ ব্যক্তিরা যে কর সুবিধা ভোগ করেন, তা বাতিল করা হতে পারে। পাশাপাশি সরকারি চাকরিজীবী ও বিচারকদের কিছু খাতে প্রাপ্ত কর সুবিধাও তুলে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর অব্যাহতি পর্যালোচনায় গঠিত কমিটি এসব সুবিধা সীমিত বা বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, আইএমএফ সব ধরনের কর অব্যাহতি তুলে দিতে সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে। সে অনুযায়ী সরকার অব্যাহতি সুবিধা কোথাও সীমিত, কোথাও একেবারে তুলে দেওয়ার জন্য কাজ করছে। এনবিআরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে আয়কর খাতে করছাড়ের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ১৩২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এর মধ্যে করপোরেট খাতে প্রায় ৭৩ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা এবং ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর খাতে প্রায় ৩৩ হাজার ১৪৩ কোটি টাকা করছাড় দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ মোট করছাড়ের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সুবিধা পেয়েছে প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তারা।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, কেবল বেতন ও বোনাসকে করযোগ্য ধরা হওয়ায় সরকারের প্রায় ৮২ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী আয়করের আওতার বাইরে থাকছেন। একই কারণে বিসিএস ক্যাডারে যোগদানের পর প্রথম চার বছর পর্যন্তও অনেক ক্ষেত্রে আয়কর দিতে হয় না। সরকারি চাকরিজীবীদের প্রায় ৪২ ধরনের আয় বর্তমানে করমুক্ত। এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব আয় করের বাইরে রাখা হয়েছে। তবে মূল বেতন, উৎসব ভাতা ও বোনাসকে করযোগ্য আয় হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এগুলোর ওপর নির্ধারিত হারে আয়কর পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।

আয়কর আইন-২০২৩ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ করবর্ষে যেসব পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাসিক মূল বেতন ২৬ হাজার ৭৮৫ টাকা এবং নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাসিক মূল বেতন ৩০ হাজার ৩৫৭ টাকা বা তার বেশি, তাদের আয়ের পরিমাণ করমুক্ত সীমা অতিক্রম করছে। ফলে তাদের বেতন বিল প্রস্তুতের সময় উৎসে আয়কর কর্তন বাধ্যতামূলক করেছে এনবিআর। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেটে এসব অব্যাহতির সীমিত বা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। অপরদিকে ২০১৭ সালে এনবিআর সরকারি কর্মচারীদের ভাতাকে করের আওতামুক্ত রেখে প্রজ্ঞাপন জারি করে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিভিন্ন স্বশাসিত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চাকরিজীবীরা করমুক্ত বিভিন্ন সুবিধা পান। এছাড়াও কোনো আইন, বিধি বা প্রবিধানের অধীনে কোনো পদে নিয়োজিত থাকাকালীন সরাসরি সরকারি কোষাগার হতে বেতন বা আর্থিক সুবিধা যারা পাবেন তারা করমুক্ত সুবিধা ভোগ করবেন। এই তালিকায়ও অব্যাহতির সুবিধা সীমিত করতে পারে এনবিআর।

সূত্র আরও জানায়, নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো বর্তমানে যে কর ছাড় সুবিধা পায়, সেটিও আগামী অর্থবছর থেকে বাতিল হতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের সংগঠন এবং আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের ওপর কর আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে। তেল কোম্পানি, হাসপাতাল, বন্দর এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশিদের আয়ের ওপর কর বসতে পারে।

এ ছাড়া দাতা সংস্থা, গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও কর অব্যাহতির তালিকায় রয়েছে। ট্রাস্ট, ব্যবসায়িক সংগঠন এবং পাটজাত পণ্য উৎপাদনে বিদ্যমান করমুক্ত সুবিধা তুলে দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আছে। তৈরি পোশাক খাতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত ১২ শতাংশ করপোরেট কর নির্ধারিত থাকলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে এনবিআর কমিটি। একইভাবে গ্রামীণ ব্যাংকের কর অব্যাহতি সুবিধা ২০২৯ সালের পর আর বাড়ানো না-ও হতে পারে বলে সুপারিশ করা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে আইএমএফের চাপ থাকা সত্ত্বেও কিছু সুবিধা বহাল রেখে বাকিগুলো মেয়াদ শেষে পর্যালোচনার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে ২৫০টির বেশি এসআরও সুবিধা বাতিল হতে পারে, যার অধিকাংশের মেয়াদ আগামী ৩০ জুন শেষ হচ্ছে। পাশাপাশি আরও কিছু এসআরও সুবিধা পর্যালোচনা করে বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর।

সূত্র: বিজনেস বার্তা

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version