ভ্যাট ও করব্যবস্থার ওপর প্রস্তাবিত বিষয়গুলোর কয়েকটি সংশোধনী আনা হচ্ছে, আবার কয়েকটি প্রত্যাহার হতে পারে। এ ছাড়া ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা ও সঞ্চয়পত্রের ওপর করারোপে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে সরকার।
পাশাপাশি ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করা হতে পারে। এসব সংশোধনী এনে প্রস্তাবিত অর্থ বিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস করা হচ্ছে আজ সোমবার। এরপর কাল মঙ্গলবার (৩০ জুন) সংসদে পাস করা হবে বাজেট ২০২৬-২৭, যা আগামী ১ জুলাই থেকেই কার্যকর করা হবে। অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এদিকে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তীব্র আপত্তি, অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রস্তাবিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর ও ভ্যাটব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা করছে সরকার। এর মধ্যে খুচরা ব্যবসায় প্যাকেজভিত্তিক ভ্যাট, ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা, আয়কর স্ল্যাব এবং জমির মূলধনী মুনাফা কর—এই পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংসদে বাজেট পাসের আগে এবং অর্থ বিলের চূড়ান্ত অনুমোদনের সময় এসব প্রস্তাবে সংশোধন আনা হতে পারে।
বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছিল, বছরে ৫০ লাখ টাকার কম বিক্রয় বা টার্নওভার রয়েছে এমন খুচরা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দিষ্ট বা ‘স্পেসিফিক’ ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করা হবে।
ব্যবসার অবস্থান ও ধরন অনুযায়ী মাসিক এক হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভ্যাট নির্ধারণের পরিকল্পনা ছিল।
তবে এ প্রস্তাব বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানির আশঙ্কা এবং বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কার কারণে সরকার আপাতত এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে বলে জানা গেছে।
অর্থ বিলে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবও পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের করযোগ্য আয় না থাকলেও তাদের ব্যাংকিং সেবা প্রয়োজন। ফলে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক চাপ তৈরি হতে পারে।
বাড়তে পারে করমুক্ত আয়সীমা : করদাতাদের জন্য স্বস্তির খবর হচ্ছে, ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমান তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ টাকা করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সূত্র জানায়, করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা হতে পারে এবং তা ২০২৭-২৮ অর্থবছরেও বহাল থাকতে পারে।
আয়কর স্ল্যাবে আসতে পারে পরিবর্তন : করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির পাশাপাশি আয়করের বিভিন্ন স্তর বা স্ল্যাবেও পরিবর্তন আনার আলোচনা চলছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের ওপর করের চাপ কমাতে কিছু সমন্বয় আনা হতে পারে।
জমির মূলধনী মুনাফা কর কমানোর চিন্তা : জমি উন্নয়ন প্রকল্পে ভূমির মালিকদের জন্য প্রস্তাবিত ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা করও সংশোধনের পথে রয়েছে। ব্যবসায়ী ও আবাসন খাতের প্রতিনিধিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এ হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, উচ্চ করহার বহাল থাকলে ভূমি উন্নয়ন ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হতে পারে।
ব্যবসায়ীদের স্বস্তি, আরো পর্যালোচনার দাবি : ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, হঠাৎ করে নতুন কর ও ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করা হলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদরা কর ও ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও বাস্তবায়নের আগে পর্যাপ্ত গবেষণা ও প্রস্তুতির ওপর জোর দিয়েছেন।
সামগ্রিকভাবে বাজেটের বিতর্কিত কয়েকটি প্রস্তাব নিয়ে সরকারের নমনীয় অবস্থান ব্যবসায়ী ও করদাতাদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কী হবে, তা নির্ভর করবে সংসদে অর্থ বিল পাস এবং সরকারের শেষ মুহূর্তের পর্যালোচনার ওপর।


