দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জালিয়াতি ও ৮৫৭ কোটি টাকা আত্মসাতের মামলায় এক্সিম ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মাকসুদা খানমের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও তিনি এখনও স্বপদে বহাল রয়েছেন এবং প্রতিদিনের মতো নিয়মিত অফিস করছেন।

গত বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) দুদকে তার হাজিরা দেওয়ার কথা থাকলেও তিনি উপস্থিত হননি। অথচ একই মামলার প্রধান আসামি ব্যাংকের সাবেক এমডি ও সিইও মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই মামলার দুই আসামির প্রতি এমন ভিন্ন আচরণ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে প্রশ্ন উঠেছে।

দুদকের সহকারী পরিচালক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহজাহান মিরাজ বলেন, ‘উত্তরোত্তর তদন্তের জন্য আমরা তাদের ডেকেছিলাম। যারা আসেননি, তাদের আবার তলব করা হবে। দ্বিতীয়বারও উপস্থিত না হলে তারা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ হারাবেন।’দুদকে হাজিরা না দেওয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মাকসুদা খানমের অতীত ঘিরে নতুন করে উঠে এসেছে বেশকিছু অভিযোগ। ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূত্র বলছে, তিনি নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তার প্রভাবেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নামে–বেনামে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গুলশান শাখার ব্যবস্থাপক থাকাকালে এসব ঋণ অনুমোদনে মাকসুদার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।এক্সিম ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, নজরুল–সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি তার মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে নাসা গ্রুপের দুই উর্ধ্বতন কর্মকর্তা সাইফুল ও রঞ্জন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ তুলেছেন। বগুড়ার সাবেক এমপি রফিকও কয়েক শ’ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নজরুলের মেয়ের জামাই এবং তার মেয়ে আনিকাও বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন পান বলে জানা যায়, যেখানে মাকসুদার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লেগেছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি করে রাওয়া ক্লাবের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেজর (অব.) আফসারের নামে অনুমোদিত প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ। দুই বছর আগে আফসারের মৃত্যুর পর তার পরিবার জানায়, তিনি কখনো এ ধরনের ঋণ নিয়েছেন—এ তথ্য তাদের জানা ছিল না। এতে ধারণা জোরালো হয়েছে যে প্রকৃতপক্ষে এই ঋণ নজরুল ইসলাম মজুমদারের সুবিধার্থেই নেওয়া হয়েছিল।সূত্রের খবর, নজরুলের ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমেই মাকসুদা খানম ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি এক্সিম ব্যাংকের ডিএমডি পদে পদোন্নতি পান। তার বিরুদ্ধে অনুমোদনবহির্ভূত ঋণ প্রদানের অভিযোগ তখনই ব্যাংকের ভেতরে আলোচনা সৃষ্টি করেছিল। এমনকি গুলশানে প্রায় আট কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাট উপহার হিসেবে পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। যার বিষয়ে ব্যাংকের একাধিক সূত্র বলছে, বড় অঙ্কের লোন পাস করিয়ে দেওয়ার প্রতিদান হিসেবেই এই ফ্ল্যাট তাকে দেওয়া হয়েছিল। তবে মাকসুদা এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, তিনি কলাবাগানে নিজস্ব ফ্ল্যাটে থাকেন।চাকরিজীবনের শুরুতে ১৯৯৫ সালে ন্যাশনাল ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে যোগ দেওয়া মাকসুদা ১৯৯৯ সালে এক্সিম ব্যাংকে আসেন। সেখানে স্বল্প সময়ের মধ্যে একাধিক ধাপ অতিক্রম করে তিনি গুলশান শাখার ব্যবস্থাপক, পরে আঞ্চলিক প্রধান এবং পরবর্তী সময়ে ডিএমডি পদে উন্নীত হন। ব্যাংকের অভ্যন্তরে অনেকেই মনে করেন, তার এই দ্রুত উত্থান যোগ্যতার তুলনায় ‘ব্যক্তিগত প্রভাবের’ ফল বেশি।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে মাকসুদা খানম বলেন, ‘এই লোনগুলো চারটি শাখা থেকে দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে গুলশান শাখার দায়িত্বে আমি ছিলাম। আর এই মামলার আসামি সবাই তো অফিস করছে।’ দুদক সূত্র জানিয়েছে, দ্বিতীয়বার তলবের পরও হাজির না হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে একই মামলায় একজন আসামির গ্রেপ্তার ও আরেকজনের অনায়াসে অফিস করা, এ বৈষম্য ঘিরে ব্যাংকিং মহলে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version