শক্তিশালী ঝড় ‘ক্রিস্টিন’ পর্তুগালের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। বন্যা, ভূমিধস এবং ঝড়ো হাওয়ার কারণে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হয়েছেন এবং ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।

পর্তুগাল সরকার এই ঝড়কে ‘জলবায়ুজনিত চরম ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ঝড়ের কারণে বহু স্কুল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং দেশজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

উপকূলীয় শহর ফিগুয়েইরা দা ফোজে একটি ফেরিস হুইল উল্টে যায়। সেখানে একটি ভবনের ছাদ উড়ে গিয়ে কয়েকটি গাড়ির ওপর পড়ে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

গত কয়েক দিনে একের পর এক ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছে পর্তুগাল। সপ্তাহান্তে আরেকটি ঝড়ে বন্যার পানিতে গাড়ি ভেসে যাওয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছিল।

সিভিল প্রোটেকশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৫০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়া এবং টানা ভারী বৃষ্টির কারণে দেশজুড়ে ৩ হাজারের বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অনেক মানুষ গাছ বা ধ্বংসাবশেষের আঘাতে আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে শক্তিশালী বাতাস রেকর্ড করা হয়েছে লেইরিয়ার মন্টে রিয়াল বিমানঘাঁটিতে, যেখানে বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৭৮ কিমি। ঝড়ের তীব্রতায় সেখানে পর্যবেক্ষণ যন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল ভূখণ্ডে ঝড়ের প্রবেশপথ সম্ভবত এ এলাকা ছিল।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ই-রেডেস জানিয়েছে, এই ঝড়ের কারণে ৮ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন।

সিভিল প্রোটেকশন সংস্থা এএনইপিসি জানায়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত লেইরিয়া জেলায় তিনজন মারা গেছেন। সেখানে একজন ধাতব পাতের আঘাতে নিহত হন, আরেকজন একটি বাড়ির কাঠামোর নিচে চাপা পড়ে মারা যান। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, ভিলা ফ্রাঙ্কা দে শিরা এলাকায় একটি গাছ গাড়ির ওপর পড়লে একজনের মৃত্যু হয়েছে। মারিনহা গ্রান্দে এলাকাতেও একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

ঝড়ের কারণে পর্তুগালজুড়ে পরিবহন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। লিসবন থেকে উত্তরের প্রধান মহাসড়কসহ বহু সড়ক ও রেলপথ ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে গেছে।

সমুদ্র উত্তাল থাকায় উপকূলীয় ১০টি এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। পর্তুগিজ ইনস্টিটিউট অব দ্য সি অ্যান্ড অ্যাটমোসফিয়ার (আইপিএমএ) জানিয়েছে, কোথাও কোথাও ঢেউয়ের উচ্চতা ১৪ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পাবলিক সিকিউরিটি পুলিশ (পিএসপি) কোইমব্রা ও লেইরিয়ার বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার আহ্বান জানিয়েছে।

সিভিল প্রোটেকশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অব্যাহত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়ন করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

লেইরিয়ার মেয়র গনসালো লোপেস সরকারকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমাদের বহু স্থান পুরোপুরি তছনছ হয়ে গেছে। আগামী কয়েক মাসে এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিশাল পুনর্গঠন প্রচেষ্টা লাগবে। শহরের ওপর এর প্রভাব যেন বোমা পড়ার মতো, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।”

পর্তুগাল অতিক্রম করার পর ঝড় ‘ক্রিস্টিন’ পূর্ব দিকে সরে গিয়ে স্পেনে প্রবেশ করেছে। স্পেনেও ঝড়ের প্রভাবে দেশজুড়ে ব্যাপক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। স্কুল, সড়ক ও রেললাইন বন্ধ এবং লাখো মানুষ বিদ্যুৎহীন। আন্দালুসিয়ায় জরুরি পরিষেবাগুলো প্রায় ২ হাজার দুর্যোগসংক্রান্ত ঘটনা রিপোর্ট করেছে।

স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা এএমইটি সতর্ক করে জানিয়েছে, কিছু এলাকায় বাতাসের গতি হারিকেনের মতো শক্তিশালী হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আলমেরিয়ার কিছু অংশে ঝড়ের তীব্রতার কারণে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version