** মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৪ শতাধিক কর পরিদর্শকের পদ খালি, যা রাজস্ব আদায়ে প্রভাব পড়ছে
** চূড়ান্ত সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশের ৫ মাস পেরিয়ে গেলেও পদোন্নতি না দেওয়ায় হতাশ কর্মচারী
** তালিকায় নাম রয়েছে এবং পদোন্নতির যোগ্য হয়নি— এমন অনেকে ষড়যন্ত্র করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে
কোটা বাতিলের আন্দোলন থেকে সরকার পতন হলেও কোটার খপ্পর থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কোটার কারণে প্রায় এক দশক ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত ১০ম গ্রেড থেকে ২০তম গ্রেডের বহু কর্মচারী। বিশেষত কর রাজস্ব বিভাগের মাঠ পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতিতে কোটার বৈষম্য মারাত্মক। বঞ্চিত কর্মচারীদের আন্দোলনে মুখে গত নভেম্বরে কোটা বাতিল করে নতুন বিধিমালা করা হয়। কিন্তু নতুন বিধিমালা জারির কয়েক প্রায় মাস পেরোলেও বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী। তারা আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে কোটা ব্যবস্থা রক্ষায় তৎপর। ফলে মাঠ পর্যায়ে প্রায় ৪ শতাধিক কর পরিদর্শকের পদ খালি রয়েছে, যাতে রাজস্ব আদায়ে সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
কর বিভাগ (১০ম থেকে ২০তম গ্রেড) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৬ সালের বিধি অনুযায়ী, কর পরিদর্শকের মোট শূন্য পদের ৫০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করা হতো। কিন্তু পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রধান সহকারী ও উচ্চমান সহকারী পদের কর্মচারীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া ছিল। ১৪তম গ্রেডের এই কর্মচারীদের জন্য কর পরিদর্শক পদের ৬২ শতাংশ কোটা বা সংরক্ষিত রাখা ছিল। একই গ্রেডের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক পদের জন্য ২৯ শতাংশ এবং ১৩তম গ্রেডের ষাট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর ও ব্যক্তিগত সহকারীদের জন্য ৯ শতাংশ পদ সংরক্ষিত ছিল। কোটা পদ্ধতিতে ২০১৭ থেকে শুরু করে সর্বশেষ ২০২৫ সালে ১৯৭ জন পদোন্নতি পেয়ে কর পরিদর্শক হয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান সহকারী ও ষাট-লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর বা ব্যক্তিগত সহকারীরা পাঁচ বছর চাকরির অভিজ্ঞতা থাকলেই কর পরিদর্শক হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আর উচ্চমান সহকারীরা এবং ষাট-মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটরদের জন্য ৮ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা দরকার হতো। যেসব কর্মচারীদের কোটা বেশি এবং অভিজ্ঞতার সীমা কম, তারা পদ্ধতিতে বড় সুবিধাভোগী হয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি কোটা ও সবচেয়ে কম অভিজ্ঞতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী প্রধান সহকারীরা। অর্থাৎ ফিডার পদ পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়ে যেত। অথচ কম কোটার কারণে বেশি অভিজ্ঞতা নিয়েও একই গ্রেডের অন্যরা পদোন্নতি পেত না। অর্থাৎ জ্যেষ্ঠ হয়েও প্রতিবার অন্তত ৩ বছর পড়তেন তারা।
এনবিআর সূত্রমতে, কোটা পদ্ধতি বাতিল করে সমন্বিত গ্রেডেশন তালিকা তৈরি করতে আন্দোলন করেন কর্মচারীরা। এরই প্রেক্ষিতে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় এনবিআর। ২০২৫ সালের প্রথম দিকে এনবিআর থেকে এই বিধিমালা সংশোধনের জন্য প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে উপদেষ্টা পরিষদ, পিএসসি, আইন মন্ত্রণালয় হয়ে ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর ‘কর বিভাগ (১০ম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেড) নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’-নামে গ্রেজেট প্রকাশ করা হয়। এই সংশোধিত বিধিমালার মাধ্যমে এনবিআরের অন্তত এক যুগের বেশি সময় ধরে থাকা কোটা পদ্ধতির বিধিমালার অবসান হয়। আর সংশোধিত এই বিধিমালার মাধ্যমে ‘কর বিভাগ (১০ম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০১৬’ বিধিমালা রহিত বা বাতিল করা হয়। সূত্র আরও জানায়, সংশোধিত বিধিমালার কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে এনবিআর কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি একেবারে বন্ধ করে দেয়। শুধু এনবিআর নয়, সারা দেশে সব কর অঞ্চল বিধিমালার দোহাই দিয়ে কর্মচারীদের সব পদোন্নতি বন্ধ করে দেয়। সংশোধিত বিধিমালা ২ নভেম্বর গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। ৩ নভেম্বর এই বিধিমালা অনুযায়ী এনবিআর ৬২ জন কর পরিদর্শককে ‘অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনার (ইএসিটি)’ পদে পদায়ন করে। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা জারির সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতির জট খুলতে শুরু করে। সব কর অঞ্চলে কর্মচারীদের পদোন্নতি দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু যাদের আন্দোলনের কারণে বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে, সেই কর্মচারীরা কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক সূত্রমতে, বিধিমালা, ২০১৬ অনুযায়ী ২০১৭, ২০১৮, ২০১৯, ২০২২, ২০২৩ এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৫ মে ১৯৭ জনকে কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এই বিধিমালা অনুযায়ী কোটা পদ্ধতিতে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। আর এই কোটার কারণে কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতিতে বেশিরভাগ কর্মচারী বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন-ষাট-মুদ্রাক্ষরিক, উচ্চমান সহকারী, প্রধান সহকারী ১৪তম গ্রেড। ১০ বছর চাকরি করার পর তাদের ফিডার পদ পূর্ণ হয়ে যায়। আর ব্যক্তিগত সহকারী, সাঁট-লিপিকার ১৩তম গ্রেড। উচ্চমান সহকারী ও ষাট-মুদ্রাক্ষরিক একসঙ্গে চাকরিতে যোগদান করলেন। বিধিমালা, ২০১৬ অনুযায়ী ১৪তম গ্রেড ৬২ শতাংশ কোটা। ফলে ফিডার পদ পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পেয়ে যেতো। অথচ পার্সেন্টেজে কম হওয়ার কারণে একই গ্রেডের অন্যরা পদোন্নতি পেতো না। অর্থাৎ জ্যেষ্ঠ হয়েও প্রতিবার তারা ৪-৫ বছর পদোন্নতির গ্যাপে পড়ে যেতো। এই কোটা পদ্ধতির কারণে ব্যক্তিগত সহকারী ও সাঁট-লিপিকার পদ থেকে সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্রমতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কোটা পদ্ধতি বাতিল করে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে সমন্বিত তালিকার ভিত্তিতে পদোন্নতির দাবিতে কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। নতুন বিধিমালার কাজ শুরুর পর কর পরিদর্শক পদসহ কর্মচারীদের সব পদোন্নতি বন্ধ হয়ে যায়। গতবছর ২ নভেম্বর ‘কর বিভাগ (১০ম গ্রেড হতে ২০তম গ্রেড) নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫’ জারির মাধ্যমে কোটা পদ্ধতির অবসান হয়। নতুন বিধিমালা জারির সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতির জট খুলতে শুরু করে। পরদিন ৬২ জন কর পরিদর্শক পদোন্নতি পেয়ে ‘অতিরিক্ত সহকারী কর কমিশনার (ইএসিটি)’ হন। কিন্তু যাদের আন্দোলনের কারণে বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে, সেই কর পরিদর্শক পদে পদোন্নতি আটকে আছে। অথচ নতুন বিধিমালা অনুযায়ী কর পরিদর্শক নিয়োগে গত ২ মার্চ ৬৫৫ জনের চূড়ান্ত সমন্বিত জ্যেষ্ঠতা তালিকা প্রকাশ করে এনবিআর। সূত্র জানায়, এর আগে কোটার সুবিধাভোগীদের চাপে বিতর্ক এড়াতে নতুন বিধিমালার বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে মতামত চায় এনবিআর। ৩০ নভেম্বর জনপ্রশাসন থেকে অনাপত্তি জানিয়ে মতামত দেওয়া হয়।
অপরদিকে কোটার সুবিধাভোগীদের একটি পক্ষ নতুন বিধিমালা ও পদোন্নতির সমন্বিত তালিকা চ্যালেঞ্জ করে বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আশীফ হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চে একাধিক রিট আবেদন করা হয়। এসব মামলার মধ্যে একটিতে হাইকোর্ট ২৪ ফেব্রুয়ারি ৭৪টি কর পরিদর্শক পদ খালি রেখে পদোন্নতি দেওয়ার আদেশ জারি করে। কিন্তু পদোন্নতিপ্রার্থীদের পক্ষে আপিলের ভিত্তিতে গত ১৬ মার্চ আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ওই আদেশ ৮ সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে। আরেকটি মামলায় গত ১২ মার্চ ওই নিয়োগবিধির আলোকে প্রস্তুত করা জ্যেষ্ঠতার তালিকা ৩ মাসের জন্য স্থগিত করে হাইকোর্ট। কিন্তু পদোন্নতিপ্রার্থীর আপিলের (৯৪১/২০২৬) প্রেক্ষিতে আপিল বিভাগ ৩১ মার্চ হাইকোর্টের রায়কে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত করে ওই দিন পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করে।
এই বিষয়ে পদোন্নতি বঞ্চিতদের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ সাইফুল আলম জাতীয় অর্থনীতিকে বলেন, ‘তিনটি রিট হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম দুটি রিটে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে যে আইন হয়েছে, সেটা হয়েছে কোটার ভিত্তিতে। রিটকারীদের জন্য ৬২ শতাংশ কোটা থাকতো। ২০২৫ সালের যে সংশোধিত আইন হয়েছে, তাতে বলা হয়েছে কম্বাইন্ড লিস্ট হবে। কারো জন্য কম, কারো জন্য বেশি হবে না। স্টেনো, প্রধান সহকারীসহ পাঁচটি পদের সবাই সমানুপাতিক হারে পাবেন। তারা চ্যালেঞ্জ করেছেন যে সংশোধিত আইনে তাদের ডিপ্রাইভ করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তার ২০১৬ সালের আইনটা তারা চায়। তাদের জন্য কোটা রিজার্ভ চেয়েছেন। আদালত তাদের যতজন রিট করেছেন, সে ক’জনের জন্য কোটা রিজার্ভ রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। পরবর্তীতে এনবিআর ও যারা কম্বাইন্ড লিস্ট চেয়েছেন, তারা আপিলাত ডিভিশনে আসার পর চেম্বার জজ তা স্ট্রে করে দিলো। অর্থাৎ তাদের জন্য যে ক’টি পদ রিজার্ভ রাখার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা স্ট্রে করে দেওয়া হয়েছে। তারা আইনটা চ্যালেঞ্জ করেছে। পদোন্নতির কোন বিষয় আর সেখানে নেই। দ্বিতীয়বার তারা পদোন্নতিও চ্যালেঞ্জ করলে চেম্বার জজ তা স্ট্রে করে দিয়েছে। এখন শুধু তারা যে আইনটা চ্যালেঞ্জ করেছে, সেটার উপর শুনানি হবে। ফলে এনবিআর এখন কম্বাইন্ড লিস্ট অনুযায়ী পদোন্নতি দিতে আইনগত আর কোনো বাধা নেই।’
এই আইনজীবীর মতে, একটি রিটের স্থগিতাদেশের মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আমরা কোর্টে আবেদন করেছি। শুনানির জন্য দুইবার আদালতের তালিকায় ছিল। কিন্তু কোর্টের সময় না হওয়ায় শুনানি হয়। তবে আদালতের শুনানির তালিকায় থাকলে, শুনানি হলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ অটো বাড়ে বলে আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতোপূর্বে একাধিকবার প্রশাসনিক ট্রাইবুনাল/হাইকোর্ট বিভাগের রায়কে আপিল বিভাগ কর্তৃক স্থগিত করার পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র: বিজনেস বার্তা


