জাপানে রোববার আকস্মিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জনমত জরিপে ইঙ্গিত মিলেছে—দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীলরা বড় ধরনের জয় পেতে পারেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম কয়েক মাসে তার জনপ্রিয়তা বাড়ায় এ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
টোকিও থেকে এএফপি এখবর জানায়।
তবে তিন মাসের শাসনামলে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায়, আরও আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিশালী তাকাইচি আঞ্চলিক রাজনীতি বা এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির জন্য কী অর্থ বহন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
৬৪ বছর বয়সী কট্টর রক্ষণশীল তাকাইচি গত অক্টোবরে জাপানের পাঁচ বছরে পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী হন। তাকাইচি তরুণ বয়সে হেভি মেটাল ড্রামার ছিলেন এবং মার্গারেট থ্যাচারের ভক্ত হিসেবে পরিচিত।
এর আগে একসময় শক্তিশালী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) টানা কয়েকটি নির্বাচনে বিপর্যয়ের মুখে পড়ে এবং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়।
সাধারণ জাপানিদের মধ্যে, বিশেষ করে তরুণদের কাছে তাকাইচি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি কিছুটা ফ্যাশন আইকন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বেশ আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন।
১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মাকোতো হারা এএফপিকে বলেন, ‘শুধু তিনি নারী বলেই নয়ৃ বরং তিনি এমন একটি সমাজের ধারণা তুলে ধরেছেন, যেখানে মানুষ ভবিষ্যৎ নিয়ে আশা করতে পারে।’
অভিবাসন বিষয়ে তার কঠোর অবস্থান আপাতত ‘জাপানিজ ফার্স্ট’ স্লোগানধারী জনতাবাদী সানসেইতো পার্টির উত্থানও অনেকটা থামিয়ে দিয়েছে।
ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ (গ্রিপস)-এর জাপানি রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক মিকিতাকা মাসুয়ামা বলেন, ‘তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেন, তা সহজে বোঝা যায়।’
তার পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তার ভেতরে অনেক ভাবনা ছিল, কিন্তু তিনি একাডেমিকদের মতো কথা বলতেন।’
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কিছুটা কমলেও তাকাইচির মন্ত্রিসভার অনুমোদনের হার প্রায় ৭০ শতাংশের কাছাকাছি, যা আগের প্রশাসনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
রোববারের নিম্নকক্ষ নির্বাচনের আগে জরিপগুলোতে—যদিও অনির্ধারিত ভোটারদের কারণে কিছু সতর্কতা রয়েছে—ইঙ্গিত মিলেছে, এলডিপি সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে প্রয়োজনীয় ২৩৩টির বেশি আসন পেতে পারে।
এলডিপি ও তাদের জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টির (জেআইপি) ক্ষমতাসীন জোট ৪৬৫টি আসনের মধ্যে ৩০০টির বেশি আসন পেতে পারে, যা তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেবে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক পার্টি (সিডিপি) ও এলডিপির সাবেক জোটসঙ্গী কোমেইতো মিলে গঠিত নতুন সেন্ট্রিস্ট রিফর্ম অ্যালায়েন্স তাদের বর্তমান ১৬৭টি আসনের প্রায় অর্ধেক হারাতে পারে।
তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে তাকাইচি নিয়মিত ইয়াসুকুনি মন্দিরে যেতেন, যেখানে জাপানের যুদ্ধাহতদের স্মরণ করা হয়। এ স্থানটি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সম্পর্কের জন্য স্পর্শকাতর ইস্যু।
দায়িত্ব নেওয়ার দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি ইঙ্গিত দেন, চীন যদি বলপ্রয়োগ করে স্বশাসিত তাইওয়ান দখলের চেষ্টা করে, তবে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে।
চীন কখনো গণতান্ত্রিক তাইওয়ান শাসন করেনি, কিন্তু বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের সম্ভাবনা নাকচ করেনি।
এর কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জাপানে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা জানানোর পর তাকাইচির এই মন্তব্যে বেইজিং তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
চীন টোকিওর রাষ্ট্রদূতকে তলব করে, নাগরিকদের জাপান সফরে সতর্ক করে এবং রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ বিমান মহড়া চালায়।
গত মাসে জাপানে অবশিষ্ট দুটি পান্ডাও- যেগুলো দীর্ঘদিন ধরে বেইজিংয়ের কূটনৈতিক প্রতীকে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল- চীনে ফেরত নেওয়া হয়।
টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক অধ্যাপক ই কুয়াং হেং বলেন, নির্বাচনে তাকাইচি শক্ত অবস্থান পেলে চীনের সঙ্গে উত্তেজনা উল্টো কমতেও পারে।
তিনি বলেন, ‘বেইজিং শক্তিকে স্বীকৃতি দেয় এবং তারা মনে করতে পারে যে তিনি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবেন এবং চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি। তাই তাদের কোনো না কোনোভাবে তার সঙ্গে কাজ করতেই হবে।’
অর্থনীতি ও বাজার উদ্বেগ
তাকাইচির অর্থনৈতিক নীতিও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ১৩৫ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার) প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর বন্ডের সুদহার বেড়েছে এবং ইয়েনের মান ওঠানামা করেছে।
জাপানের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় ঋণের অনুপাত ইতোমধ্যে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরে তা ২৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মাসে দীর্ঘমেয়াদি জাপানি বন্ডের সুদহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে, যখন তাকাইচি মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে খাদ্যপণ্যে আট শতাংশ ভোগকর প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি দেন।
গত সপ্তাহান্তে তিনি দুর্বল ইয়েনের সম্ভাব্য সুবিধার কথা বলায় বাজারে আরও উদ্বেগ তৈরি হয়, যদিও তার অর্থমন্ত্রী বারবার বলেছেন, মুদ্রাকে সহায়তা দিতে টোকিও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ সূর্য বলেন, তাকাইচি ‘অর্থনৈতিকভাবে বেপরোয়া’ হবেন বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি জনঅর্থ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে বন্ডবাজারই সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।’

