আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা প্রথমে ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব ছিল এবং তা দুই অর্থবছরের জন্য নির্ধারণের কথা বলা হয়; তবে চূড়ান্ত বাজেটে এ সীমা আরও ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে, ফলে করমুক্ত আয়ের সীমা মোট ৫০ হাজার টাকা বাড়ছে। একই সঙ্গে খুচরা ব্যবসায়ী পর্যায়ে একক ভ্যাট হার চালুর পরিকল্পনা থেকেও আপাতত সরে আসছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, বাজেটে আরও কিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যা অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কার্যকর হবে এবং আজ সোমবার তা পাস হওয়ার কথা রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা জানান, কম আয়ের করদাতাদের স্বস্তি দিতে এবং সমাজের বিভিন্ন পর্যায় থেকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা চার লাখ টাকা হওয়ার কথা ছিল ২০২৮-২৯ অর্থবছরে। পরের বছর একই হার বহাল রেখে ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এটা সাড়ে চার লাখ টাকা করার পরিকল্পনা ছিল।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), আর সেই প্রেক্ষিতে নতুন করে সীমা বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে সংস্থাটি; সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন একে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি কম আয়ের করদাতাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে এবং দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতির কারণেই তারা এ দাবি জানিয়েছিলেন; পাশাপাশি তিনি সতর্ক করে বলেন, করকাঠামোর অতিরিক্ত ভ্যাট নির্ভরতা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাই এ কাঠামোর সংস্কারের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
খুচরা ব্যবসায় ভ্যাট বসছে না
এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটে খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য এলাকাভেদে একক ভ্যাটহার আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তবে আগামী বাজেট থেকেই এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে জানায় এনবিআর সূত্র। এনবিআরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখনই এ নিয়ে বিধিমালা তৈরি হচ্ছে না। কিছুটা সময় নিয়ে এটি করা হবে। তাই বাজেটের পরই এটি কার্যকর হবে না, তবে বিষয়টি আইনে যুক্ত থাকবে। ফলে বিধিমালা করা হলে সরকার যেকোনো সময় এটা কার্যকর করতে পারবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক বিক্রির পরিমাণ ৫০ লাখ টাকার নিচে, এমন ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা ছিল এনবিআরের। প্রতি মাসে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত এই ভ্যাট হওয়ার কথা ছিল। বিষয়টি নিয়ে ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মুদিদোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ ১৬টি খুচরা ও সেবামূলক খাতকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে একক করের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসবের মধ্যে মিষ্টির দোকান ও রেস্তোরাঁও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সংসদে অর্থমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া হয়। খুচরা ব্যবসায়ীদের পক্ষে থেকে এটা বাতিলের দাবি জানানো হয়। গত শনিবার বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সংবাদ সম্মেলন করে এর বিরোধিতা করে। সংগঠনটির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন এমন ভ্যাটে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জানতে চাইলে মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, সারা দিন দোকান করে যে জীবন ধারণ করে, তার ওপর ভ্যাট আরোপ করার কোনো মানে হয় না। মোট ভ্যাটের ৯৮ শতাংশ দেয় মাত্র ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান, কিন্তু নিবন্ধিত আছে ৮ লাখ প্রতিষ্ঠান। বাকিরা কোথায়? তাদের না খুঁজে অতি ছোটদের ভ্যাট আরোপ করার প্রয়াস অন্যায়।
তিন মাস পরপর ভ্যাট
চূড়ান্ত বাজেটে ভ্যাট ব্যবস্থাপনা সহজ করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে এনবিআর। প্রস্তাবিত বাজেটে মাসিকের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমার সুযোগ রাখার কথা বলা হলেও ভ্যাট জমা দেওয়ার সময় মাসিক রাখা হয়েছিল; তবে চূড়ান্ত বাজেটে রিটার্নের পাশাপাশি ভ্যাট জমার সময়ও তিন মাস নির্ধারণ করা হচ্ছে। এতে রিটার্ন ও ভ্যাট জমার তথ্যের মধ্যে অসংগতি কমবে বলে মনে করছেন রাজস্ব কর্মকর্তারা। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের কর পরিপালন খরচ কমবে এবং তারা মূলধন আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারবেন। তবে কর বিশেষজ্ঞরা কিছু ঝুঁকির কথাও বলছেন, কারণ তিন মাস পর ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ থাকায় খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে।
জানতে চাইলে এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ৩৫ বছর ধরে ব্যবসায়ীরা প্রতি মাসে ভ্যাট দিচ্ছেন। এখন তিন মাস পর নেওয়া হলে কেউ সেই টাকা অন্য কাজে ব্যয় করে ফেললে ভ্যাট খেলাপি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আবার সরকার বছর শেষে ভ্যাট পাবে ৯ মাসের।

