মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শুক্রবার (৬ মার্চ) বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ৯৩ ডলার ছাড়িয়েছে, যা সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৩ সালের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এটিই অপরিশোধিত তেলের সর্বোচ্চ মূল্য।
উৎপাদন বন্ধ হওয়ার সতর্কবার্তা
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক দেশগুলো আগামী কয়েক দিনের মধ্যে উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। তার এই মন্তব্যের পর বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে।
সাধারণ মানুষের জীবনে সম্ভাব্য প্রভাব
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম বাড়ার এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ব্যাপক প্রভাব পড়বে। পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হিটিং, খাদ্যপণ্য এবং আমদানিকৃত পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
কাতার এনার্জি জানিয়েছে, তাদের এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্রে সামরিক হামলার কারণে তারা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। সাদ আল-কাবি সতর্ক করে বলেন, যুদ্ধ যদি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীর মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বজুড়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে পারে। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠবে এবং শিল্প-কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এর ফলে চীন, ভারত ও জাপানের মতো বড় অর্থনীতির দেশগুলো, যারা অপরিশোধিত তেলের জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা
জ্বালানি বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান রাইস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক হোর্হে লিওন এই পরিস্থিতিকে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি ‘বাস্তব ঝুঁকি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বোঝা যাচ্ছে না এটি সাময়িক সংকট, নাকি বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শুরু। যদি সরবরাহ ব্যবস্থা দুই সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ থাকে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।”
যুক্তরাজ্যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি
পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই ইউরোপে পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের বাজার তদারকি সংস্থা প্রতিযোগিতা ও বাজার কর্তৃপক্ষ এবং জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সংস্থা অফজেম পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ইতোমধ্যে দেশটিতে পেট্রল ও ডিজেলের দাম ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছানোর আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কাছে কয়েক সপ্তাহের তেল মজুত থাকলেও সেই মজুত শেষ হয়ে গেলে এবং উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তখন বিভিন্ন দেশ তাদের জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করতে পারে, যেমনটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় করা হয়েছিল।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনার্জি আসপেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা অম্রিতা সেন বলেন, অনেক ব্যবসায়ী প্রথমে মনে করেছিলেন সংঘাত দ্রুত শেষ হবে। তাই সপ্তাহের শুরুতে তেলের দাম বৃদ্ধির গতি তুলনামূলক কম ছিল।
তিনি বলেন, রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সময় তেলের দাম অল্প সময়ের জন্য ১২৮ ডলার পর্যন্ত উঠলেও পরে দ্রুত কমে যায়। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ সরাসরি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সামনে কী হতে পারে
বাজার বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম আবার স্থায়ীভাবে তিন অঙ্কে পৌঁছাতে পারে।
একটি বড় জ্বালানি কোম্পানির এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তেলের দাম তিন অঙ্কে পৌঁছানো ততই নিশ্চিত হয়ে উঠবে। এটি শুধু সম্ভাবনা নয়—শেষ পর্যন্ত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।”
সূত্র: ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস


