নতুন একটি জীবন খোঁজার আশায় শরণার্থী শিবির থেকে শুরু হয়েছিল যাত্রা। দুই দশক পর সেই ছেলেই ফুটবল বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের ইতিহাস গড়লেন। তুরস্কের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার ২-০ গোলের জয়ে প্রথম গোলটি করে নেস্টোরি ইরানকুন্ডা শুধু দলের জয় নিশ্চিত করার পথই সহজ করেননি, বরং বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবেও নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

এরপর শুরু হয় স্বপ্নপূরণের গল্প। ২০০৬ সালে তানজানিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া ইরানকুন্ডার শিকড় বুরুন্ডিতে। গৃহযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে বাঁচতে তার বাবা-মা দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রতিবেশী দেশে। পরে পরিবারসহ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান তিনি। সেখানেই ফুটবল হয়ে ওঠে তার নতুন পরিচয় গড়ার হাতিয়ার।

অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা ইরানকুন্ডা খুব অল্প বয়সেই নিজের প্রতিভার জানান দেন। অ্যাডিলেড ইউনাইটেডের যুব দলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। গতি, শক্তি এবং আক্রমণভাগে তীক্ষ্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে দ্রুত আলাদা করে তোলে। ক্লাবটির সিনিয়র দলের হয়ে ১৬ গোল ও আট অ্যাসিস্ট করে ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজর কেড়ে নেন এই তরুণ।

তার সেই পারফরম্যান্সের পুরস্কার আসে ২০২৪ সালে, যখন জার্মান জায়ান্ট Bayern Munich-এ যোগ দেন তিনি। যদিও মূল দলে নিয়মিত সুযোগ পাননি, তবে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার Harry Kane-এর মতো তারকাদের সঙ্গে অনুশীলন ও সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাকে নিতে হয়েছিল একটি কঠিন সিদ্ধান্ত। বায়ার্নে পর্যাপ্ত খেলার সুযোগ না পাওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, জাতীয় দলে নিজের অবস্থান শক্ত করতে হলে নিয়মিত মাঠে নামা জরুরি। সুইজারল্যান্ডের Grasshopper Club Zürich-এ ধারে খেলার পর তিনি স্থায়ীভাবে বায়ার্ন ছেড়ে ইংল্যান্ডের Watford FC-তে যোগ দেন।

দলবদলের পর এক সাক্ষাৎকারে ইরানকুন্ডা বলেছিলেন, ‘এটি একটি কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশ্বকাপে খেলা। নিয়মিত ম্যাচ খেলার সুযোগ দরকার ছিল, যা আমি পাচ্ছিলাম না।’

সেই সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ২০২৪ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের পরিকল্পনায় যুক্ত হন তিনি। নিজের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচেই ফিলিস্তিনের বিপক্ষে গোল করে জাতীয় দলের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। এরপর ধীরে ধীরে সকারুজদের আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন এই তরুণ ফরোয়ার্ড।

আর বিশ্বকাপের মঞ্চে এসে তিনি লিখলেন নতুন ইতিহাস। ভ্যাঙ্কুভারে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচের ২৭তম মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে আসা পল ওকোন-ইঙ্গস্টলারের লম্বা পাস নিয়ন্ত্রণে নেন বাঁ প্রান্তে। এরপর দুরন্ত গতিতে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে পাঠান। সেই গোলেই ২০ বছর ১২৫ দিন বয়সে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ইতিহাসের পাতায় নাম লেখান নেস্টোরি ইরানকুন্ডা। শরণার্থী শিবির থেকে বিশ্বকাপের নায়ক হয়ে ওঠার এই গল্প তাই শুধু একটি গোলের নয়, বরং সংগ্রাম, সাহস আর স্বপ্ন জয়ের অনন্য এক কাহিনি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version