ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা শনিবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে তীব্র আতঙ্ক ও উত্তেজনার মধ্যেও ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। তবে একই সময়ে ইরানের সেনাবাহিনী প্রধান যুক্তরাষ্ট্রকে যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসনের বিষয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন।

প্যারিস থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি দেন। এর পরই ইরানের উপকূলে বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-সহ একটি নৌ-বহর মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বেড়েছে।

ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, হামলা হলে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি, যুদ্ধজাহাজ এবং তাদের মিত্র দেশ—বিশেষ করে ইসরাইলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাবে।

তবে ট্রাম্প মনে করেন, সামরিক সংঘাতের চেয়ে ইরান তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতেই বেশি আগ্রহী হবে। তেহরানও জানিয়েছে, যদি ক্ষেপণাস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আলোচনার সূচিতে না থাকে, তবে তারা পারমাণবিক বিষয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত।

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোয় বৈঠকের একদিন পর ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান আলী লারিজানি বলেন, “মিডিয়ায় যুদ্ধের প্রচারণা সত্ত্বেও আলোচনার কাঠামোগত প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে।”

অন্যদিকে ইরানের সেনাপ্রধান আমির হাতামি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে সতর্ক করে বলেন, তাদের বাহিনী সর্বোচ্চ সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, “শত্রুরা কোনো ভুল করলে তা তাদের নিজেদের নিরাপত্তা, এ অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং জায়নবাদী শাসনের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করবে।”

তিনি আরও বলেন, ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও অর্জিত অভিজ্ঞতা কোনোভাবেই ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

এই উত্তেজনার মধ্যেই শনিবার ইরানের বন্দরনগরী আব্বাসে একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস এটিকে গ্যাস লিকেজজনিত দুর্ঘটনা বলে দাবি করলেও নাশকতার গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। তবে কর্তৃপক্ষ সে দাবি নাকচ করেছে।

রেভোল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের কোনো স্থাপনায় হামলা হয়নি। একই সঙ্গে তাসনিম নিউজ এজেন্সি নৌ-কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরিকে হত্যার গুজবও মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, হরমুজ প্রণালীতে আইআরজিসি দুই দিনের সরাসরি গোলাবর্ষণ মহড়া চালাবে। এক বিবৃতিতে সেন্টকম আইআরজিসিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর আশপাশে ‘অনিরাপদ ও অপেশাদার আচরণ’ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানায়।

এর জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লেখেন, “আমাদের উপকূলে এসে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন হুকুম দিচ্ছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী কীভাবে মহড়া চালাবে।”

উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যা তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে।

এর আগে গত জুনে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত চলাকালে ইরানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে গত ২৮ ডিসেম্বর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ইরানে বিক্ষোভ শুরু হয়, যা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ৮ ও ৯ জানুয়ারি এই আন্দোলন চরমে পৌঁছায়। ইরানি কর্তৃপক্ষ এ আন্দোলনের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের উসকানির অভিযোগ করে।

সরকারি হিসাবে এসব বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন ৩ হাজার ১১৭ জন। তবে মানবাধিকার সংস্থা ‘এইচআরএএনএ’ জানায়, তারা ৬ হাজার ৫৬৩ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে ৬ হাজার ১৭০ জন বিক্ষোভকারী এবং ১২৪ জন শিশু রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে শনিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সরকারকে জনগণের কথা শোনার ও জনসেবায় মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।

তুরস্ক সীমান্ত এলাকায় অবস্থানরত অনেক ইরানি নাগরিক বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্বের শাসন থেকে মুক্তি চান। শবনম ছদ্মনামে এক নারী বলেন, “আমরাও মুক্তি চাই। তুরস্কের মতো পর্যটক দেখতে চাই। সবাই আমাদের সন্ত্রাসী ভাবে। মোল্লাদের শাসনে আমরা একশ বছর পিছিয়ে গেছি।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “ওরা আমাদের পিঠে গুলি করেছে, এমনকি জানালা দিয়েও লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। সবাই প্রিয়জন ও বন্ধু হারিয়েছে।”

রোজালিন নামে ২৯ বছর বয়সী আরেক নারী বলেন, “আমেরিকার চাপ যথেষ্ট নয়। আমেরিকা সাধারণ মানুষের জন্য নয়, বরং নিজেদের স্বার্থে—তেলের জন্যই আসবে।”

এদিকে শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা রুহুল্লাহ খোমেনির মাজার জিয়ারত করেন। সেখানে তিনি প্রার্থনা করেন। এ সময় ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ১০ দিনের উৎসব কর্মসূচি শুরু হয়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version