নির্বাচনকে ঘিরে দেশের ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ ও রাজনৈতিক পছন্দে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। সাম্প্রতিক এক জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগে আগ্রহী হলেও তরুণ ও নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক ঝোঁকে এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।

আসন্ন নির্বাচনে দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পছন্দের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের রদবদলের আভাস পাওয়া গেছে। বিশেষ করে তরুণ ও নতুন ভোটারদের বড় একটি অংশের (৩৭.৪ শতাংশ) প্রথম পছন্দ হিসেবে উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামী।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘আনকাভারিং দ্য পাবলিক পালস: এ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ (বিইপিওএস) যৌথভাবে এই জরিপ পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দুই ধাপে দেশের ১৮০টি আসনের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের ওপর এ জরিপ চালানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন সিআরএফের স্ট্র্যাটেজিক কো-অর্ডিনেটর জাকারিয়া পলাশ। বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের ভিজিটিং প্রফেসর ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী।

জরিপে দেখা যায়, ৯০ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিতে আগ্রহী হলেও প্রায় ৮ শতাংশ ভোটার এখনো অংশগ্রহণের বিষয়ে অনিশ্চিত। ভোটারদের মধ্যে ৩০.২ শতাংশ প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে চান এবং ৩৩.২ শতাংশ দল ও প্রার্থী—উভয়কেই বিবেচনায় নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ভোটারদের অগ্রাধিকার তালিকায় ধর্মীয় ইস্যুর চেয়ে সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। জরিপ অনুযায়ী, ৬৭.৩ শতাংশ ভোটারের কাছে আগামী নির্বাচনের প্রধান ইস্যু দুর্নীতি। এ ছাড়া ৬৩ শতাংশ ভোটার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, ৫৫.৪ শতাংশ উন্নয়ন এবং ৫১ শতাংশ নিরাপত্তার বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন। বিপরীতে ধর্মীয় বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন ৩৫.৯ শতাংশ ভোটার।

রাজনৈতিক পছন্দের পরিবর্তন বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দেওয়া ভোটারদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে পছন্দ করছেন। ২৯ শতাংশ ঝুঁকছেন জামায়াতে ইসলামী দিকে, ৬.৫ শতাংশ এনসিপিকে এবং ১৩ শতাংশ অন্যান্য দলকে পছন্দ করছেন। ২.৪ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন।

অন্যদিকে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণ ভোটারদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী (৩৭.৪ শতাংশ)। এরপর বিএনপি (২৭ শতাংশ) ও এনসিপি (১৭ শতাংশ)। তবে ১৮.৬ শতাংশ তরুণ ভোটার এখনো কোনো দল বা প্রার্থী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি।

নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়েও প্রতিবেদনে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ভোটারদের বড় একটি অংশ ভোটকেন্দ্রে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জালিয়াতি এবং ব্যালট দখলের আশঙ্কা করছেন। বিএনপির ৪৯ শতাংশ এবং জামায়াতের ৭১ শতাংশ সমর্থক মনে করেন, ভোটকেন্দ্রে ভয়ভীতি সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি ব্যালট ছিনতাই ও সরকারি পক্ষপাতিত্বের আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এই জরিপের ফলাফল আসন্ন নির্বাচনের রাজনৈতিক চিত্র ও ভোটারদের মানসিকতার পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আলোচকরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version