ফুটবলের মানচিত্রে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনার অবস্থান যেন দুই প্রান্তে। একদিকে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ—মাঝখানে প্রায় ১৭ হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস কিংবা জীবনযাত্রায় মিল খুবই সামান্য। তবু ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই এই দূরত্ব যেন মুহূর্তেই হারিয়ে যায়। তখন লাল-সবুজের বাংলাদেশ মিশে যায় আকাশী-সাদার আবেগে, আর কোটি মানুষের হৃদয়ের কেন্দ্রে জায়গা করে নেয় লিওনেল মেসি ও তার দল।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই বাংলাদেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার পতাকার আকাশী-সাদা রঙের ঢেউ। বাড়ির ছাদে উড়ে বিশাল আকৃতির পতাকা, দেয়ালজুড়ে আঁকা হয় প্রিয় তারকাদের প্রতিকৃতি, আর দলের জয়ে মধ্যরাতে রাজপথে নেমে আসে হাজারো মানুষের আনন্দমিছিল। যেন এটি কেবল একটি খেলা নয়, বরং এক উৎসব, এক আবেগের নাম।

বিশেষ করে লিওনেল মেসির প্রতিটি গোল কিংবা আর্জেন্টিনার প্রতিটি জয়ে বাংলাদেশের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত এক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম—সবখানেই উঠে আসে বাংলাদেশি সমর্থকদের বাঁধভাঙা ভালোবাসার গল্প।

এই ভালোবাসা ও সমর্থনের খবর এখন আর্জেন্টিনার মূলধারার গণমাধ্যমেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারিত হচ্ছে।

আর্জেন্টিনার টেলিভিশন চ্যানেল লা নাসিওন মাস বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের উন্মাদনা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ আর্জেন্টিনা ফুটবল দলকে সমর্থন করেন।

আরেক আর্জেন্টাইন টেলিভিশন চ্যানেল ৮ মার দেল প্লাটা বাংলাদেশি সমর্থকদের উল্লাসের একটি ভিডিও শেয়ার করে লিখেছে, “মেসির গোলগুলো এভাবেই উদযাপন করেছে বাংলাদেশ।”

দেশটির জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেল এ২৪-ও বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বিশদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের জন্য বাংলাদেশে উন্মাদনা।”

বাংলাদেশিদের এই আবেগ নিয়ে বিশেষ আয়োজন করেছে আর্জেন্টিনার জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান টেলিনুয়েভে। তাদের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “বাংলাদেশ সবসময় আর্জেন্টিনার সঙ্গে।” একইভাবে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্রীড়া দৈনিক ডায়রিও ওলে বাংলাদেশি সমর্থকদের উন্মাদনাকে আখ্যা দিয়েছে “অবিশ্বাস্য ও আবেগঘন” হিসেবে।

শুধু আর্জেন্টিনাই নয়, বাংলাদেশের এই ফুটবলপ্রেম নজর কেড়েছে বৈশ্বিক গণমাধ্যমেরও। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি, পাশাপাশি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ও দ্য গার্ডিয়ান বাংলাদেশের আর্জেন্টিনা সমর্থকদের নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশ করেছে।

এমনকি বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা-র অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতাতেও স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের ফুটবল উন্মাদনা। বাংলাদেশের দর্শকদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ভিডিও প্রকাশ করে তারা ঢাকাকে ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদন ও আবেগের অনন্য উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

হাজার হাজার কিলোমিটারের দূরত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা—সবকিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশ ও আর্জেন্টিনাকে এক সুতোয় বেঁধেছে ফুটবল। আর সেই বন্ধনের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছেন লিওনেল মেসি ও আকাশী-সাদা জার্সিধারীরা। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে তাই নতুন করে প্রমাণিত হয়—ফুটবল শুধু একটি খেলা নয়, এটি মানুষের হৃদয়কে একত্রিত করার এক অসাধারণ শক্তির নাম।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version