সঞ্চয়ের বিপরীতে সদস্যদের সুদ দিয়ে থাকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো। এ সুদের হার ৬ থেকে ১২ শতাংশ। সদস্যদের অল্প অল্প করে সঞ্চয় করা টাকার বিপরীতে অর্জিত সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটতে চায় সরকার। এ কর আদায়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বিভিন্ন উপ-কর কমিশনারের কার্যালয় থেকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হচ্ছে।মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) থেকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৩৩টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট সদস্য ৪ কোটি ৭৩ লাখ। তাঁদের সঞ্চয় স্থিতির পরিমাণ ৯৫ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। আর ঋণগ্রহীতা সদস্যের সংখ্যা ৩ কোটি ৬১ লাখ।

বিদ্যমান ২০২৩ সালের আয়কর আইনের ১০২ (১) ধারা অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দিচ্ছে এনবিআর। ওই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংক, বিমা, লিজিং, ফাইন্যান্স কোম্পানি, সমবায় বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুদ বা মুনাফা দিলে, সেখান থেকে আগেই উৎসে কর কেটে রাখতে হবে। কোম্পানি, ট্রাস্ট ও ব্যক্তিসংঘকে সুদ বা মুনাফা দিলে কর কাটতে হবে ২০ শতাংশ। অন্যদের ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ।

এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই ‘অন্যদের’ মধ্যেই রয়েছে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সঞ্চয় করা সদস্যদের পাওয়া সুদ। কোনো সঞ্চয়কারী যদি ১০০ টাকা সুদ পান, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান তা থেকে ১০ টাকা কেটে রেখে তাঁকে ৯০ টাকা দেবে এবং ১০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা করবে। এনবিআরের চিঠিতে বলা হয়েছে, আয়কর আইন অনুযায়ী সদস্যদের সঞ্চয়ের বিপরীতে দেওয়া সুদের ওপর উৎসে কর কাটার কথা থাকলেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তা কাটেনি। ফলে সরকারি কোষাগারে কোনো টাকা জমা হয়নি। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সুদের ওপর উৎসে কর কেটে এখন একসঙ্গে জমা দিতে হবে। দেরির জন্য ২ শতাংশ জরিমানাসহ এ-চালানের মাধ্যমে কাল মঙ্গলবারের মধ্যে টাকা জমা দিতে হবে।

এমআরএ থেকে সনদপ্রাপ্ত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্য সঞ্চয়ের সুদকে করমুক্ত রাখার দাবিতে ২২ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এনবিআরের চেয়ারম্যান, পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) চেয়ারম্যান, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছে ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। সিডিএফ হচ্ছে ১২৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কিং সংস্থা।

সিডিএফের চেয়ারম্যান ও দেশের অন্যতম ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশনের (পপি) নির্বাহী সচিব মুর্শেদ আলম সরকার গতকাল বলেন, ১০–২০ টাকা করে সঞ্চয় করেন সদস্যরা। সরকার যেখানে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে শক্তিশালী করছে, তার বিপরীতে এই ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে উৎসে কর কেটে নেওয়ার উদ্যোগ সাংঘর্ষিক হয়ে যায়। এতে একদিকে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে, অন্যদিকে গরিব মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে উঠবে না।

সিডিএফের আবেদনে বলা হয়েছে, পরিবারের কারও অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ফসলহানি বা আকস্মিক আয়সংকটের সময়ে এই সঞ্চয় আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করে। এটি অনানুষ্ঠানিক বিমার মতো সহায়তা দেয়। সিডিএফ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সদস্যদের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ তাদের কার্যক্রমেরই অংশ। এমআরএ আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা ও কার্যাবলির অংশ হিসেবে সদস্যদের কাছ থেকে আমানত নেওয়া হয়। আর এমআরএ বিধিমালা, ২০১০ অনুযায়ী আমানতের ওপর নির্ধারিত সুদ পাওয়া সদস্যদের অধিকার। ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো যে সুদ দিয়ে আসছে, তা করমুক্ত হিসেবেই বিবেচিত হয়। অথচ সম্প্রতি সদস্যদের কাছ থেকে উৎসে কর কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এ কর আরোপ হলে দরিদ্র মানুষ সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

ক্ষুদ্রঋণ খাতে সদস্যদের কাছ থেকে নেওয়া সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে উৎসে কর কাটার নিয়ম প্রযোজ্য কি না, তা আইনে স্পষ্ট করা হয়নি বলেও মনে করে সিডিএফ। সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ ছিল ৭৯ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। এর ওপর গড়ে ৬ শতাংশ হারে সুদ দিলে মোট সুদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা। এ সুদের ওপর ১০ শতাংশ হারে উৎসে কর কাটলে করের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৪৭৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

ক্ষুদ্রঋণ ও সঞ্চয় নিয়ে কাজ করা এনজিওগুলোর আয়কর নথি রয়েছে, এমন একটি কর অঞ্চলের কর কমিশনারের সঙ্গে গতকাল রোববার কথা হয়। তিনি বলেন, আয়কর আইনে আমানতের মুনাফার ওপর উৎসে কর কাটার বিধান রয়েছে এবং ব্যক্তি পর্যায়ে ১০ শতাংশ হারে এ কর কাটার নিয়ম আছে। কর কর্মকর্তারা সেই আইনই পরিপালন করছেন। তাঁর মতে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসে কর জমা থেকে ছাড় দেওয়া হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সুবিধা দাবি করতে পারে। তবে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক সঞ্চয়কারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) যদি এনবিআরকে উৎসে কর থেকে ছাড় দেওয়ার অনুরোধ করে, তাহলে তা বিবেচনা করা হতে পারে। এ বিষয়ে এমআরএর নির্বাহী ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের সুদের ওপর উৎসে কর প্রযোজ্য হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি নিয়ে শিগগির সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করবে এমআরএ।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version