গণভোট ও আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনি বিভ্রান্তি, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং নির্বাচন কমিশন ও সরকারের সমন্বয়হীনতায় জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশ পাওয়া রাষ্ট্র সংস্কারের গণআকাঙ্ক্ষা গুরুতর ঝুঁকিতে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এসব সংকট পুরো গণভোট ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি: টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে এ উদ্বেগের কথা জানান সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বের একটি গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, অস্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। তার ভাষায়, “এই বিভ্রান্তি পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।”

ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, নির্বাচন কমিশন তার ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন অনেক ক্ষেত্রে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না। অনলাইন ও অফলাইন উভয় পরিসরে আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও ইসি কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার অভিযোগ, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট সরাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে না। তিনি বলেন, “এক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থ বা মানি ডিপেন্ডেন্সি বড় ভূমিকা রাখছে।” নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ না থাকায় ভবিষ্যৎ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না বলেও তিনি মত দেন।

গণভোট ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তার মতে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোদুল্যমান ছিল। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, তা গণভোটের প্রশ্ন ও উদ্দেশ্যকে আরও অস্পষ্ট করেছে।

তিনি একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে জটিল বলে আখ্যা দেন। তার ভাষায়, সবচেয়ে বড় আইনি বিচ্যুতি হলো নির্বাচন কমিশনের গণভোটকে নির্বাচন হিসেবে বিবেচনা করা। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়, কারণ এখানে কোনো ব্যক্তি বা আসনের পক্ষে ভোট দেওয়া হয় না।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা আইনত নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণার নির্দেশনা দিয়েছে, যা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তার মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসির সম্মতি নেওয়া জরুরি ছিল।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ইসি আইনের ভুল ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করে কার্যত নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনায় অর্থায়ন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, গণভোটের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উৎসারিত ‘জুলাই সনদ’। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

টিআইবির পক্ষ থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাবও তুলে ধরেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করা।

এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ এবং ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়োগের দাবি জানান তিনি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল প্রত্যাশা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি দেশবাসীকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘না’ এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version